ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর অন্তত আগামী ৩০ দিনে দেশটিতে কোনো নির্বাচন হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রয়োজনে মার্কিন সেনা মোতায়েন রেখে ওয়াশিংটন সরাসরি ভেনিজুয়েলার পরিচালনায় দায়িত্ব নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। ট্রাম্প আরো দাবি করেছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ১৮ মাসের মধ্যেই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে। এদিকে ভেনিজুয়েলার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো দ্রুত দেশে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে শিগগিরই একটি নির্বাচন দাবি করেছেন তিনি। নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, তার দল একটি অবাধ নির্বাচনে জয়ী হতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
তবে এখনই নির্বাচন সম্ভব নয় জানিয়ে এনবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আগে দেশটিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, তার পরই ভোটের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও হোয়াইট হাউজের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে কাজ করবেন। কে শেষ পর্যন্ত দায়িত্বে থাকবেন প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প জবাব দেন, ‘আমি।’
ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ১৮ মাসের মধ্যেই পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারে বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প। বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে এবং এক্ষেত্রে মার্কিন কোম্পানিগুলোই নেতৃত্ব দেবে বলে জানান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক টাকা লাগবে, সেই টাকা তেল কোম্পানিগুলোই খরচ করবে। পরে আমরা তাদের ক্ষতিপূরণ দেব, অথবা তারা রাজস্ব আয় থেকে তা তুলেও নেবে।’
সিবিএস নিউজের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, বড় মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা এ সপ্তাহেই প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসার পরিকল্পনা করছে। ১৮ মাসের সময়সীমা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ১৮ মাসেরও কম সময়ে উৎপাদন বাড়তে পারে, তবে এতে বিপুল ব্যয় হবে। তার মতে, ভেনিজুয়েলাকে পুনরায় বড় তেল উৎপাদনকারী হিসেবে গড়ে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক। কারণ এতে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কম রাখতে সহায়তা মিলবে।
তবে যেসব বিশ্লেষক আগে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো বিনিয়োগ চূড়ান্ত করতে কোম্পানিগুলোকে আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা পেতে হবে। তাছাড়া বিনিয়োগের পরও প্রকল্পগুলোর ফল পেতে বহু বছর সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রাথমিক অবস্থায় উৎপাদন বাড়লেও তা বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
দেশটিতে প্রমাণিত তেলের মজুদ রয়েছে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। কিন্তু ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, এ বিপুল মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ এনে দিতে পারে।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে শেভরনের মুখপাত্র বিল তুরেন বলেন, কোম্পানি এখন কর্মীদের নিরাপত্তা, স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা ও আইনগত বিধিনিষেধ মেনে চলার বিষয়েই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অন্যদিকে কনোকোফিলিপস, যারা বহু আগেই ভেনিজুয়েলা থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে, তাদের মুখপাত্র ডেনিস নুস জানিয়েছেন, তারা ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি ও এর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য প্রভাব পর্যবেক্ষণ করছেন। তৃতীয় বড় কোম্পানি এক্সনমোবিল এ বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে সামনে আসা দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। তবে মাদুরোকে সরিয়ে দেয়ার আগে তার শিবিরের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো যোগাযোগ হয়েছিল, এমন ধারণা সরাসরি নাকচ করেন তিনি। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, মাদুরোকে সরাতে ভেনিজুয়েলার ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা গোষ্ঠীর সঙ্গে কি আগে কোনো চুক্তি হয়েছিল? উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেকেই চুক্তি করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি অন্যভাবে এটা করব।’ মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলের সহযোগিতা ছাড়াই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। রদ্রিগেজের সঙ্গে তার সরাসরি কথা হয়েছে কিনা এ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, সিনেটর মার্কো রুবিও তার সঙ্গে সাবলীল স্প্যানিশে কথা বলেন। তাদের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
রদ্রিগেজ যদি সহযোগিতা বন্ধ করেন, তবে ভেনিজুয়েলায় দ্বিতীয় দফা সামরিক অভিযান চালানো হতে পারে, এমন ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প। যদিও তিনি আশা করেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় গড়াবে না। তার ভাষায়, ‘আমরা প্রস্তুত। সত্যি বলতে কী, আমরা ধরেই রেখেছিলাম যে আবারো যেতে হবে।’
ভেনিজুয়েলায় হামলা ও মাদুরোকে আটক করতে নতুন করে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। এ বিষয়ে সমালোচনার পরও তিনি দাবি করেন, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে কংগ্রেসের আলাদা অনুমোদন তার প্রয়োজন নেই। তার ভাষায়, ‘কংগ্রেসে আমাদের ভালো সমর্থন আছে। কংগ্রেস শুরু থেকেই জানত আমরা কী করতে যাচ্ছি। তারা কেন আমাদের বিরোধিতা করবে?’